কৃষি-প্রসেসিং মানচিত্র — সুযোগ ও মডেল
এই অধ্যায় শেষে আপনি পারবেন: বাংলাদেশের কৃষি-প্রসেসিং (agro-processing — কৃষিপণ্যকে শুকিয়ে/ভেঙে/চেপে/প্যাক করে বেশি দামে বিক্রিযোগ্য পণ্যে বদলানো) বাজারটা পুরো একটা মানচিত্রের মতো দেখতে — কোথায় ফাঁক, কোন সাব-নিশে কম পুঁজিতে ঢোকা যায়, কেনই বা এই সেক্টর "antifragile" (ফলন বেশি হলে কাঁচামাল সস্তা, তাই গ্লাটেই আপনার লাভ); আর সাতটা সাব-নিশের ভেতর থেকে আপনার জন্য একটা বেছে নিতে — হাতে-কলমে, ৳-হিসাবসহ।
এই বই (বই ১৮ — কৃষি-প্রসেসিং ও মূল্য-সংযোজিত কৃষি গাইড) একটি সেক্টর-গাইড। সাধারণ পদ্ধতি — আইডিয়া যাচাই, ইউনিট ইকোনমিক্স, মার্কেটিং, সাপ্লাই, আইন — মূল ৯টি বইয়ে বিস্তারিত আছে; এখানে সেগুলো পুনরাবৃত্তি নয়, cross-ref। আমরা শুধু কৃষি-প্রসেসিং-সেক্টরের নির্দিষ্ট জ্ঞানে গভীরে যাব। এই অধ্যায়ের সঙ্গী করিম (কাল্পনিক) — পুরো বই জুড়ে তাকে আমরা এক ধাপ এক ধাপ এগিয়ে নেব।
১. একটা গল্প দিয়ে শুরু
বড় ভাই, একটা ছবি কল্পনা করুন। আশ্বিন মাস, রাজশাহীর একটা আমবাগান। গাছভর্তি আম, এত আম যে ডাল ভেঙে পড়ছে। অথচ চাষি মন খারাপ করে বসে আছেন। কেন? কারণ এত আম যে দাম পড়ে গেছে — পাইকার ৳১৫ কেজিও বলছে না, আর গাছের নিচে পচে যাচ্ছে মণকে মণ। এটা বাংলাদেশের কৃষির চিরচেনা ট্র্যাজেডি: ফলন ভালো হলে চাষি কাঁদে, খারাপ হলেও কাঁদে।
এবার একই বাগানের পাশে আরেকজন মানুষকে কল্পনা করুন। তার নাম ধরা যাক করিম (কাল্পনিক)। করিমের কাছে একটা ছোট মেকানিক্যাল ড্রায়ার (যান্ত্রিক শুকানোর যন্ত্র) আছে। সে ঠিক এই সস্তা মৌসুমেই কেজি-প্রতি ৳১৫-২০ টাকায় আম কিনছে, পাতলা করে কেটে শুকিয়ে আম-সত্ত্ব / শুকনো আম (dried mango) বানাচ্ছে — যেটা সারা বছর বিক্রি হয়, প্যাকেট-প্রতি অনেক বেশি দামে। চাষির যেটা বিপদ (অতিরিক্ত ফলন), করিমের সেটাই আশীর্বাদ (সস্তা কাঁচামাল)।
এই একটা দৃশ্যেই কৃষি-প্রসেসিং ব্যবসার পুরো দর্শন লুকিয়ে। আপনি চাষির প্রতিযোগী নন — আপনি চাষির বিপদের সময়ের বন্ধু, আর নিজের জন্য একটা টেকসই, মৌসুম-নিরপেক্ষ ব্যবসা।
পরিচয় করিয়ে দিই — করিম (কাল্পনিক)। বয়স ২৯, বাড়ি নাটোরের একটা গ্রামে, এখন রাজশাহী শহরে ছোট চাকরি করে। হাতে সঞ্চয় ৳৮০,০০০-এর মতো। গ্রামে বাবার সামান্য জমি, আর সবচেয়ে বড় সুবিধা — এলাকার আম-চাষি ও ফড়িয়াদের সে চেনে, কে কখন কী সস্তায় ছাড়ে জানে। করিমের এখনো কোনো নির্দিষ্ট পণ্য ঠিক নেই। এই অধ্যায়ে আমরা তাকে দিয়ে পুরো নিশ-বাছাই-প্রক্রিয়াটা চালিয়ে দেখাব — যাতে আপনি নিজেরটা চালাতে পারেন।
২. বাজারের মানচিত্র — সংখ্যায় ফাঁকটা দেখুন
কৃষি-প্রসেসিং নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিসংখ্যান আগে গেঁথে নিন, কারণ এটাই পুরো সুযোগের ভিত্তি।
একাধিক প্রতিবেদন ও বিনিয়োগ-সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষি-উৎপাদনের আনুমানিক ৭৫% বা তার বেশি অংশ এখনো অপ্রক্রিয়াজাত (unprocessed) অবস্থায় থাকে — অর্থাৎ কাঁচা বিক্রি হয়, প্রসেস করে মূল্য-সংযোজন হয় না। কিছু সূত্র আরও কড়াভাবে বলে — দেশের মোট কৃষি-উৎপাদনের মাত্র ~৫% প্রক্রিয়াজাত হয়, যেখানে ভারতে ~১০% আর থাইল্যান্ডে ~৩০% (সূত্রভেদে সংজ্ঞা ও সংখ্যা ভিন্ন হয়, তাই এগুলো আনুমানিক ও দিকনির্দেশক — ছাপার আগে হালনাগাদ উৎস থেকে যাচাই করতে হবে)।
এর মানে কী? মানে হলো — ক্ষেতের ফসল আর আপনার-আমার প্লেটের মাঝখানে একটা বিশাল ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে, যেখানে এখনো কেউ বসেনি।
আরও কয়েকটা যাচাই-করা তথ্য, যেগুলো এই ফাঁকের আকার বোঝায়: