কেন ব্যবসা, কেন এখন
এই অধ্যায় শেষে আপনি পারবেন: নিজের ভেতরের সেই তিনটা ভয় — "আমার তো বড় পুঁজি নেই," "আমার কোনো বিশেষ প্যাশন নেই," "ডিগ্রিটাও তেমন জোরালো নয়" — সোজা চোখে দেখে একটা একটা করে ভাঙতে; বুঝতে কেন আজকের বাংলাদেশে চাকরিই আর সবচেয়ে "নিরাপদ" পথ নয়; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — সাফল্যের সংজ্ঞাটা নতুন করে লিখতে। কোটি টাকা বা ইউনিকর্ন নয়, আপনার প্রথম লক্ষ্য হবে একটা ছোট, মাপা সংখ্যা: আপনার নিজের মাসিক খরচটা ব্যবসা থেকে তুলে আনা। এই অধ্যায়ের শেষে আপনি শুধু সেই সংখ্যাটা হিসাব করবেন না — সেটাকে রূপান্তর করবেন একটা গোনা-যায় এমন লক্ষ্যে: "আমার ঠিক কতজন গ্রাহক / কত প্লেট / কত পিস লাগবে।"
এই অধ্যায়ে আপনার সঙ্গী থাকবেন রাকিব (কাল্পনিক)। আমি শুধু ধারণা বুঝিয়ে আপনাকে ছেড়ে দেব না — ঢাকার বাইরের এক শহরের একজন কাল্পনিক বেকার তরুণকে আমরা পুরো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাব। তার ভয়, তার দক্ষতা-যাচাই, তার ভরাট-করা খরচের হিসাব, তার "ramen number", তার গোনা-লক্ষ্য (কতজন ছাত্র = সফল), তার প্রথম দুজন গ্রাহককে বলা হুবহু কথা, আর তার এক-বাক্যের অঙ্গীকার — সব দেখবেন। যন্ত্রটা একবার পুরো চলতে দেখলে, আপনি নিজের জন্য সেটা চালাতে পারবেন।
১. একটি গল্প দিয়ে শুরু
পরিচয় করিয়ে দিই — রাকিব (কাল্পনিক)। বয়স ২৩, থাকে ঢাকার বাইরের এক জেলা শহরে। পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স শেষ করেছে এক বছর হলো। প্রতিদিন সকালে উঠে চাকরির বিজ্ঞাপন খোঁজে — দশটা পদের জন্য দরখাস্ত করে দশ হাজার মানুষ। কয়েকটা ভাইভা দিয়েছে, "আমরা আপনাকে জানাব" শুনেছে, তারপর আর ফোন আসেনি। হাতে পুঁজি বলতে কিছুই নেই, আছে শুধু একটা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, আর বুকের ভেতর একটা চাপা ভয়। বাড়িতে কথা শুনতে হয়। আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করে — "চাকরি হলো?"
রাকিব কোনো বিরল ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর দেশে আনুমানিক ৮.৮৫ লাখ (প্রায় ৯ লাখ) স্নাতক (graduate) বেকার ছিলেন — এবং তাঁদের জন্য মন খারাপ করার চেয়ে বড় তথ্য হলো, শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার আনুমানিক ১৩.৫%, অথচ জাতীয় গড় বেকারত্ব আনুমানিক ৪.৫%-এর কাছাকাছি। অর্থাৎ — যত বেশি পড়ালেখা, তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি। এটা একটা ভাঙা প্রতিশ্রুতি। আমাদের শেখানো হয়েছিল: "ভালো করে পড়, ভালো চাকরি পাবে, জীবন সেট।" সংখ্যাগুলো বলছে সেই সমীকরণটা আর আগের মতো কাজ করছে না।
এবার রাকিবের গল্পটা আরেকভাবে ভাবুন। চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে সে যা পারে — পদার্থবিজ্ঞান ভালো বোঝায় — সেটা দিয়েই শুরু করল। প্রথমে দুজন প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েকে পড়াল। তারা পরীক্ষায় ভালো করল, অভিভাবকরা খুশি হয়ে আরও তিনজনকে পাঠালেন। ছয় মাসে ব্যাচ দাঁড়াল, এক বছরে ছোট একটা কোচিং। কোনো বিনিয়োগকারী নেই, অফিস নেই, শুরুর পুঁজি ছিল শুধু একটা হোয়াইটবোর্ড আর নিজের জানা বিষয়টা।
দুটো পথের পার্থক্য কোথায়? প্রথম রাকিব একটা সুযোগের জন্য অন্যের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে আছে। দ্বিতীয় রাকিব নিজের হাতে থাকা একটা ছোট দক্ষতাকে আয়ে রূপান্তর করেছে। এই বইটা পুরোপুরি দ্বিতীয় পথের জন্য। আর এই প্রথম অধ্যায়ের কাজ একটাই — আপনার মাথা থেকে সেই পুরোনো ভয়গুলো সরিয়ে দেওয়া যেগুলো আপনাকে শুরুই করতে দেয় না, এবং হাতে একটা স্পষ্ট, গোনা-যায় এমন লক্ষ্য তুলে দেওয়া।