ব্যবসা আসলে কী

এই অধ্যায় শেষে আপনি পারবেন: যেকোনো ব্যবসাকে — পাড়ার চায়ের দোকান থেকে bKash পর্যন্ত — একই পাঁচটি অংশে ভেঙে দেখতে; বুঝতে পারবেন কেন "ব্যবসা" মানে শুধু পণ্য বা শুধু লাভ নয়, বরং পাঁচটি অংশের একটা শিকল; শিখবেন বাজার-চাহিদা না থাকলে যত ভালো পণ্যই হোক ব্যবসা টেকে না (Iron Law); হাতে পাবেন মূল্য তৈরির ১২টি রূপের একটা মেনু — যেখান থেকে কম পুঁজির আপনি বেছে নিতে পারবেন কোন ধরনের ব্যবসা শুরু করবেন; আর সবচেয়ে দামি — শিখবেন একটা ব্যবসা খুঁড়িয়ে চললে কীভাবে আঙুল রেখে বলতে হয় "ঠিক কোন অংশটা ভাঙা"। এই অধ্যায়ের ৫-অংশের ম্যাপটাই হবে বাকি পুরো বইয়ের কম্পাস।

এই অধ্যায়ে আপনার সঙ্গী থাকবেন আরিফ (কাল্পনিক)। আমি একটা ফাঁকা কাঠামো বুঝিয়ে আপনাকে একা ছেড়ে দেব না — উত্তরার একজন কাল্পনিক তরুণকে আমরা পুরো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাব। আরিফ ইতিমধ্যেই ৩ মাস ধরে ফেসবুকে খাঁটি ঘি বিক্রি করছে, দিনরাত খাটছে, কিন্তু মাস শেষে হাতে কিছুই থাকছে না — "ব্যস্ত, অথচ লাভ নেই।" আমরা তার ব্যবসাটাকে পাঁচ অংশে এক্স-রে করব, প্রতিটা অংশ টাকার অঙ্কে কষব, খুঁজে বের করব ঠিক কোন অংশটা ফুটো, আর দেখব কোন তিনটা সিদ্ধান্ত তাকে আগামী মাসেই লাভে নিয়ে যেতে পারে। যন্ত্রটা একবার পুরো চলতে দেখলে, আপনি নিজের ব্যবসায় সেটা চালাতে পারবেন।


১. একটি গল্প দিয়ে শুরু

ভোর সাড়ে ছয়টা। মিরপুরের একটা গলির মুখে রহিম মিয়া তাঁর চায়ের দোকানের ঝাঁপ খুলছেন। স্টোভ জ্বালালেন, দুধ বসালেন, কেটলিতে পানি চড়ালেন। সাতটার মধ্যে প্রথম খদ্দের — পাশের গার্মেন্টসের একজন কর্মী — এসে দাঁড়াল। এক কাপ দুধ চা, একটা বনরুটি। রহিম মিয়া হাসিমুখে দিলেন, ১৫ টাকা নিলেন, ক্যাশবাক্সে রাখলেন।

আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ একটা দৃশ্য। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুন — এই এক কাপ চা বিক্রির পেছনে আসলে পাঁচটা আলাদা কাজ ঘটে গেল, একটার পর একটা:

  1. রহিম মিয়া ভালো চা বানালেন — মানুষ যা চায়, সেটা তৈরি করলেন।
  2. তাঁর দোকানের অবস্থান, কেটলির ভাপ, "চা গরম!" হাঁক — এসব মানুষকে টেনে আনল।
  3. খদ্দের এসে দাম জানল, রাজি হলো, এবং টাকাটা দিল।
  4. রহিম মিয়া আসলেই চা-টা হাতে তুলে দিলেন — গরম, ঠিকঠাক, প্রতিশ্রুতি মতো।
  5. দিন শেষে দেখলেন — বিক্রির টাকা থেকে দুধ-চিনি-গ্যাসের খরচ বাদ দিয়ে কিছু লাভ থাকল, যা দিয়ে তাঁর সংসার চলে।

এই পাঁচটা ধাপ বাদ দিয়ে কোনো ব্যবসা হয় না। চা ভালো না হলে কেউ ফিরে আসবে না (১ নেই)। দোকান যদি এমন কোণে হয় যেখানে কেউ যায় না (২ নেই) — বানিয়েও লাভ নেই। মানুষ যদি দাম শুনে চলে যায় (৩ নেই) — আয় নেই। চা যদি ঠান্ডা বা নোংরা গ্লাসে দেন (৪ নেই) — খদ্দের আর আসবে না। আর মাস শেষে যদি খরচই উঠে না আসে (৫ নেই) — দোকান বন্ধ।

এবার একটা চমকপ্রদ কথা বলি। বাংলাদেশের প্রথম ইউনিকর্ন bKash-ও ঠিক এই একই পাঁচটা অংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শুধু স্কেলটা আলাদা। রহিম মিয়ার "ভালো চা" — bKash-এর জায়গায় "নিরাপদে টাকা পাঠানোর সেবা"; রহিমের "চা গরম!" হাঁক — bKash-এর জায়গায় বিজ্ঞাপন আর এজেন্টের সাইনবোর্ড; রহিমের ক্যাশবাক্স — bKash-এর জায়গায় লক্ষ লক্ষ লেনদেনের ফি। অংশ পাঁচটাই এক। এটাই এই অধ্যায়ের মূল রহস্য:

পৃথিবীর প্রতিটি ব্যবসা — ছোট হোক বা বিশাল, সেকেলে হোক বা ডিজিটাল — একই পাঁচটি অংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আপনি যদি এই পাঁচটা চিনে ফেলেন, আপনি যেকোনো ব্যবসাকে এক্স-রে করে ফেলতে পারবেন — নিজেরটাসহ।