নেগোসিয়েশন মানসিকতা — প্রস্তুতি, BATNA ও জয়-জয়

এই অধ্যায় শেষে আপনি পারবেন: দরদামকে "ঝগড়া" নয়, একটা যৌথ সমস্যা-সমাধান হিসেবে দেখতে; যেকোনো আলোচনায় বসার আগে এমন প্রস্তুতি নিতে যে টেবিলেই আপনার অর্ধেক জয় হয়ে থাকে; নিজের BATNA (চুক্তি না হলে সেরা বিকল্প) আর প্রতিপক্ষের BATNA আন্দাজ করতে; সংখ্যা কে আগে বলবে — anchoring — কখন আপনি বলবেন আর কখন তাদের বলতে দেবেন তা ঠিক করতে; আর একটা ভরাট-করা প্রস্তুতি-শিট নিয়ে সাপ্লায়ার, ক্লায়েন্ট বা বাড়িওয়ালার সামনে বসতে — মাথা ঠান্ডা রেখে, সম্পর্ক না ভেঙে, কিন্তু নিজের স্বার্থ পুরোপুরি বুঝে।

এই অধ্যায়ে আপনার সঙ্গী থাকবেন রাকিব (কাল্পনিক)। আমি একটা ফাঁকা থিওরি শিখিয়ে আপনাকে একা ছেড়ে দেব না — চট্টগ্রামের একজন কাল্পনিক তরুণ উদ্যোক্তাকে আমরা একটা সত্যিকার দরদামের ভেতর দিয়ে A থেকে Z নিয়ে যাব। তার প্রস্তুতি-শিট, তার BATNA, তার হুবহু বাংলা স্ক্রিপ্ট, তার ভুল আর সামলে নেওয়া — সব দেখবেন। একটা পুরো দরদাম চলতে দেখলে আপনি নিজের জন্য সেটা চালাতে পারবেন।


১. একটা গল্প দিয়ে শুরু — কমলালেবু আর দুই বোন

দুই বোন একটা কমলালেবু নিয়ে ঝগড়া করছে। একটাই কমলা, দুজনেই চায়। শেষে মা এসে যা করেন বেশিরভাগ মানুষই তা-ই করে — কমলাটা ঠিক মাঝখান থেকে কেটে অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ করে দেন। "ন্যায্য" সমাধান, তাই না?

কিন্তু এবার দেখুন কী হলো। প্রথম বোন তার অর্ধেক কমলার রস খেয়ে খোসাটা ফেলে দিল। দ্বিতীয় বোন তার অর্ধেকের রস ফেলে দিয়ে শুধু খোসাটা নিল — সে একটা কেক বানাচ্ছিল, তার দরকার ছিল কমলার খোসা।

খেয়াল করুন কী ভয়ংকর অপচয় হলো। প্রথম বোন চাইলে পুরো রসটা পেতে পারত, দ্বিতীয় বোন চাইলে পুরো খোসাটা। অর্থাৎ দুজনেই ১০০% পেতে পারত। কিন্তু তারা পেল মাত্র ৫০%, কারণ তারা একে অপরকে কখনো জিজ্ঞেসই করেনি — "তুমি কমলাটা দিয়ে কী করবে?" তারা শুধু ঝগড়া করেছিল কতটুকু নিয়ে (অবস্থান), কেউ জিজ্ঞেস করেনি কেন (স্বার্থ)।

এই গল্পটা Roger Fisher আর William Ury তাঁদের বিখ্যাত বই Getting to Yes (১৯৮১)-এ ব্যবহার করেছেন, আর এটাই গোটা নেগোসিয়েশনের প্রাণকথা। বেশিরভাগ দরদাম "কমলা কাটাকাটি"-তে আটকে যায় — দুই পক্ষ একটা সংখ্যা নিয়ে টানাটানি করে, যেখানে আসলে একটু কথা বললেই দুজনের জন্যই বড় কিছু বের হয়ে আসত।

পরিচয় করিয়ে দিই — রাকিব (কাল্পনিক)। বয়স ২৭, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার এলাকায় একটা ছোট মোবাইল-অ্যাকসেসরির অনলাইন+অফলাইন দোকান চালায় ("RK Gadgets")। মাসে গড়ে ৩০০–৪০০টা পণ্য বিক্রি হয় — চার্জার, কেবল, কভার, ইয়ারবাড। তার সামনে এই মাসে তিনটা দরদাম: (১) ঢাকার এক সাপ্লায়ারের সাথে কেবলের নতুন দাম, (২) এক কর্পোরেট ক্লায়েন্ট যে ১০০টা ব্র্যান্ডেড পাওয়ার ব্যাংক একসাথে কিনতে চায়, আর (৩) দোকানের বাড়িওয়ালা যিনি ভাড়া ৩০% বাড়াতে চাইছেন। রাকিব দরদামে ভয় পায় — তার মনে হয় দরদাম মানেই ঝগড়া, আর ঝগড়ায় সে কাঁচা। এই অধ্যায়ে আমরা রাকিবকে দেখাব দরদাম ঝগড়া নয়, প্রস্তুতি।


২. কেন এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা (এবং কেন বেশিরভাগ মানুষ এড়িয়ে যায়)

একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার পুরো জীবনটাই আসলে একটার পর একটা দরদাম। সাপ্লায়ারের সাথে কেনা দাম, ক্লায়েন্টের সাথে বিক্রি দাম, বাড়িওয়ালার সাথে ভাড়া, কর্মীর সাথে বেতন, পার্টনারের সাথে শেয়ার, কুরিয়ারের সাথে চার্জ — প্রতিটা টাকার অঙ্ক একটা দরদামের ফল। একটা ছোট হিসাব করুন: আপনি যদি প্রতি সাপ্লায়ার-ডিলে গড়ে মাত্র ৩% ভালো দাম আদায় করতে শেখেন, আর আপনার পণ্যের কাঁচা-খরচ যদি বিক্রির ৬০% হয়, তাহলে ওই ৩% সরাসরি আপনার লাভের মার্জিনে যোগ হয় — কোনো নতুন গ্রাহক, কোনো নতুন বিজ্ঞাপন ছাড়াই। দরদাম হলো ব্যবসার সবচেয়ে সস্তা মুনাফা।