১০ গুণ একটা ফিল্টার
এই অধ্যায় শেষে আপনি পারবেন: "১০ গুণ" শব্দটা শুনে যে ভয়টা আসে — "তাহলে তো ১০ গুণ বেশি খাটতে হবে, ১০ গুণ বেশি ঘণ্টা, ১০ গুণ বেশি চাপ" — সেই ভুল ধারণাটা ভাঙতে। ১০ গুণ আসলে effort-multiplier (পরিশ্রম-গুণক) নয়, একটা filter (ছাঁকনি): এত বড় একটা লক্ষ্য যে পুরোনো পথে সেখানে পৌঁছানোই অসম্ভব, তাই সেটা আপনাআপনি আপনার কাজ-গ্রাহক-অভ্যাসকে দুই ভাগে আলাদা করে দেয় — অপরিহার্য ২০% আর বাদ-দেওয়ার ৮০%। এই অধ্যায় শেষে আপনি নিজের হাতে একটা ১০ গুণ লক্ষ্য লিখবেন, তারপর তার পাশে "তাহলে কী কী বাদ দিতেই হবে" তালিকা বানাবেন — অর্থাৎ ১০ গুণকে খাটুনির হাতিয়ার নয়, সিদ্ধান্তের ছাঁকনি হিসেবে চালাতে শিখবেন।
এই বইয়ের সঙ্গী — রাকিব (কাল্পনিক)। বয়স ৩২, কুমিল্লায় তার একটা ছোট ফার্নিচার আর হস্তশিল্পের ব্যবসা — কাঠের চেয়ার-টেবিল, বেতের ঝুড়ি, হাতে-বানানো শো-পিস। বছর তিনেক আগে ব্যবসাটা ramen-profitable হয়েছে (নিজের মাসের খরচটা অন্তত উঠে আসে — বই ১-এর সেই মাইলফলক)। তারপর থেকে বছরে একটু একটু বাড়ছে — ১০%, ১৫%। কিন্তু রাকিব ক্লান্ত। সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা — কাঠ কেনা, কারিগর সামলানো, ডেলিভারি, ফেসবুকে রিপ্লাই, ছোট অর্ডারের দরদাম — সব সে একা টানছে। বড় কিছু করার স্বপ্ন আছে, কিন্তু "আরও খাটব কীভাবে, আমি তো এখনই শেষ" — এই দেয়ালে আটকে গেছে। এই অধ্যায়ে রাকিব প্রথমবার বুঝবে: সমস্যাটা "কম খাটা" নয়, সমস্যাটা সে ভুল প্রশ্ন করছে।
১. একটা অদ্ভুত দৃশ্য দিয়ে শুরু
রাকিব (কাল্পনিক) এক সন্ধ্যায় হিসাবের খাতা খুলে বসল। লক্ষ্য একটাই — সামনের বছর আয় কীভাবে ২ গুণ করা যায়। বছরে এখন আসছে ধরা যাক ৳২০ লাখ; সে চায় ৳৪০ লাখ।
কাগজে সে যা লিখল, সেটা চেনা লাগবে: "আরও বেশি অর্ডার নেব। আরও বেশি ঘণ্টা কাজ করব। আরও দু-একজন কারিগর। আরও বেশি ফেসবুক বুস্ট। শুক্রবারেও ওয়ার্কশপ খোলা রাখব।" — অর্থাৎ যা করছে, তারই আরও। ২ গুণ আয় = ২ গুণ খাটুনি। হিসাব মেলে, কিন্তু গায়ে কাঁটা দেয় — কারণ সে এখনই ১৪ ঘণ্টা দিচ্ছে। ২৮ ঘণ্টা তো দিনে নেই।
এবার একটা পাগলামি করি। ধরুন আমি রাকিবকে বললাম — "২ গুণ বাদ দাও। লক্ষ্য করো ১০ গুণ। ৳২০ লাখ নয়, ভাবো ৳২ কোটি।"
রাকিবের প্রথম প্রতিক্রিয়া: "ভাই, পাগল নাকি? ২ গুণ করতেই জান বেরিয়ে যাচ্ছে, ১০ গুণ তো অসম্ভব।"
কিন্তু এখানেই বইটার পুরো রহস্য। কারণ ১০ গুণ ভাবার মুহূর্তে একটা জিনিস ঘটে যায় — রাকিব আর "আরও অর্ডার, আরও ঘণ্টা" লিখতে পারে না। কারণ সে নিজেই জানে, যত ঘণ্টাই দিক, একা হাতে চেয়ার বানিয়ে কোনোদিন ৳২ কোটি হবে না। অঙ্কটাই মেলে না। তাই ১০ গুণ তাকে বাধ্য করে সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন করতে: "আমার এই ব্যবসায় এমন কী আছে যেটা ১০ গুণ হতে পারে, আর কী কী আছে যেগুলো আমাকে ১০ গুণে পৌঁছাতে দেবে না?"
ধরা যাক ভাবতে ভাবতে রাকিব দেখল — তার বেতের শো-পিস আর হাতে-বোনা ঝুড়িগুলো ঢাকার বুটিক শপ আর বিদেশি ক্রেতারা খুব পছন্দ করে, মার্জিন তিনগুণ, আর এগুলো গ্রামের নারী-কারিগরদের দিয়ে স্কেল করা যায়। উল্টোদিকে তার সিংহভাগ সময় খায় কাস্টম কাঠের ফার্নিচার — কম মার্জিন, প্রতিটা আলাদা, কোনোভাবেই স্কেল হয় না, আর এটাই তাকে ১৪ ঘণ্টা আটকে রাখে।
খেয়াল করুন — ১০ গুণ লক্ষ্যটা একটা টাকাও বেশি না এনেই রাকিবকে সবচেয়ে দামি জিনিসটা দিয়ে দিল: কোনটা রাখব, কোনটা ছাড়ব — তার স্পষ্টতা। এটাই filter। এটাই এই গোটা বইয়ের প্রাণ।